সাপ্তাহিক ছুটির অতিরিক্ত ঘুমে কি সারা সপ্তাহের ঘাটতি পূরণ সম্ভব?
ডেস্ক রিপোর্ট
আপলোড সময় :
০২-১০-২০২৬ ০৩:৩১:০৫ অপরাহ্ন
আপডেট সময় :
০২-১০-২০২৬ ০৩:৩১:০৫ অপরাহ্ন
প্রতীকী ছবি
কর্মব্যস্ত সপ্তাহে পর্যাপ্ত ঘুম না হওয়ার ঘাটতি কাটাতে অনেকেই সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমিয়ে থাকেন। কেউ দুপুর পর্যন্ত ঘুমান, কেউ আবার আগের রাতে তাড়াতাড়ি ঘুমানোর চেষ্টা করেন। তবে গবেষণা বলছে, ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়ে পুরো সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি পুরোপুরি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।
বিভিন্ন গবেষণার বরাতে সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুমের ঘাটতি পূরণে কিছুটা বাড়তি ঘুম উপকারী হতে পারে। এমনকি এক রাত খুব কম ঘুমানোর পর পরের রাতে মাত্র দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুমও শরীরকে কিছুটা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে সাহায্য করতে পারে। তবে এর মানে এই নয়, সারা সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি একদিনে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ৮ হাজার প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক মানুষ নিয়মিত সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সকালে দেরি করে ঘুম থেকে ওঠেন। কিশোর-কিশোরী থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সী মানুষ একই কাজ করেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণত প্রাপ্তবয়স্কদের প্রতিদিন প্রায় ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। কিশোর-কিশোরীদের প্রয়োজন হয় ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা। কিন্তু বাস্তবে সবসময় এতটা ঘুমানো সম্ভব হয় না।
প্রশ্ন হলো—পুরো সপ্তাহের ঘুমের ঘাটতি কি সত্যিই সপ্তাহান্তে কয়েক ঘণ্টা বেশি ঘুমিয়ে পূরণ করা যায়? আর কতটা বাড়তি ঘুম শরীরের জন্য উপকারী?
প্রতিবেদনে বলা হয়, সপ্তাহান্তে বেশি ঘুমানোর প্রভাব বুঝতে হলে ঘুম নিয়ন্ত্রণকারী দুটি প্রধান প্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে হবে। প্রথমটি হলো ‘স্লিপ হোমিওস্ট্যাট’ বা ‘ঘুমের ট্যাংক’। আমরা যত বেশি সময় জেগে থাকি, তত বেশি ঘুমের চাপ জমতে থাকে। একে ‘স্লিপ ডেবট’ বা ঘুমের ঋণও বলা হয়। ফলে শুয়ে বিশ্রাম নেওয়া বা ঘুমানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ে।
দ্বিতীয়টি হলো আমাদের দেহঘড়ি। প্রতিদিন আলো ও অন্ধকারের সংস্পর্শ, তাপমাত্রার পরিবর্তন, এমনকি কখন আমরা খাবার খাই বা শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকি—এসবের মাধ্যমে এই ছন্দে ভারসাম্য তৈরি হয়। এই দুই প্রক্রিয়া যখন একসঙ্গে কাজ করে তখন পর্যাপ্ত ঘুমের পাশাপাশি আমাদের শরীরও সুস্থ থাকে।
তবে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে ঘাটতি পূরণ করতে গেলে এই দুই প্রক্রিয়াতেই ব্যাঘাত ঘটতে পারে বা ছন্দ কেটে যেতে পারে। রাতে দ্রুত ঘুমাতে যাওয়া কিংবা সকালে দেরিতে ঘুম থেকে ওঠা—উভয় ক্ষেত্রেই এটি ঘটে। কারণ সকালের অতিরিক্ত ঘুম দিনের শেষের দিকে ঘুমের চাপ কমিয়ে দেয়, ফলে সেদিন রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়। যার প্রভাব পড়তে পারে জৈব ঘড়িতে।
যেমন, শুক্রবার সকালে আপনি বেশি সময় ঘুমালেন। এতে ওই রাতে ঘুমাতে দেরি হলো। এরপর শনিবার সকাল ৬টায় অ্যালার্ম বেজে উঠলে পর্যাপ্ত ঘুম নাও হতে পারে। এভাবেই আবার শুরু হয় ঘুমের ঘাটতির চক্র।
যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব ওরেগনের স্লিপ ল্যাবের পরিচালক ও ঘুমবিষয়ক মনোবিজ্ঞানী মেলিন্ডা ক্যাসমেন্ট বলেন, ‘এটা অনেকটা প্রতি সপ্তাহে একবার করে টাইম জোন পরিবর্তন করার মতো।’ তবে ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে বাড়তি ঘুম সবসময় খারাপ নয়, কিছু পরিস্থিতিতে এটি উপকারী হতে পারে বলে জানান তিনি।
স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতার ওপর কম ঘুমের প্রভাব নিয়ে এক গবেষণায় দেখা গেছে, যারা এক রাতে মাত্র দুই ঘণ্টা ঘুমিয়েছিলেন, তাদের শরীরে দুই ধরনের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা বেড়ে যায়। পরবর্তী সময়ে বাড়তি ঘুম এর মাত্রা কিছুটা কমাতে, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে পারে।
গবেষণায় অংশগ্রহণকারী কিছু মানুষকে পরের রাতে ৮ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ দেওয়া হয়। কিন্তু এরপরও তাদের শ্বেত রক্তকণিকার মাত্রা পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। অন্যদিকে, যারা পরের রাতে সর্বোচ্চ ১০ ঘণ্টা ঘুমানোর সুযোগ পেয়েছিলেন, তাদের মাত্রা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
আরেকটি গবেষণায় ১১ জন পুরুষের ওপর পরীক্ষা চালানো হয়, যারা সাধারণত প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা করে ঘুমান। তাদের ঘুমের সময় কমিয়ে ৪ ঘণ্টা করা হয়। মাত্র ছয় রাতের এই কম ঘুম তাদের শরীরের গ্লুকোজ নিঃসরণ ও ইনসুলিনের কার্যকারিতা নষ্ট করার জন্য যথেষ্ট ছিল। দীর্ঘদিন এই পরিবর্তন অব্যাহত থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তবে ওই ১১ জনকে ছয় রাত ধরে ১২ ঘণ্টা করে ঘুমানোর সুযোগ দেওয়ার পর দেখা যায়, তাদের শারীরিক সূচকগুলো আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এসেছে।
দিনের বেলা ছোট ঘুম বা ন্যাপ কম ঘুমানো মানুষের জন্য উপকারী হতে পারে বলে উল্লেখ করা হয় প্রতিবেদনে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস ধরে নিয়মিত কম ঘুমালে মনোযোগ ধরে রাখা, দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানানোর ক্ষমতা এবং স্থানিক দিকনির্ণয় ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এক্ষেত্রে ছুটির দিনে বেশি ঘুমিয়েও ঘাটতির প্রভাব পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায় না।
সুইডেনে এক গবেষণায় ৪০ হাজারের বেশি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষকে ১৩ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এতে দেখা যায়, ৬৫ বছরের কম বয়সী যেসব মানুষ নিয়মিত রাতে ৬ থেকে ৭ ঘণ্টা ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম ছিল। অন্যদিকে, যারা ৫ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তাদের মৃত্যুঝুঁকি ৬৫ শতাংশ বেশি ছিল।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, যারা রাতে ৫ ঘণ্টা বা তার কম ঘুমাতেন, তারা যদি সপ্তাহান্তে ঘুমের ঘাটতি কিছুটা পূরণ করেন, তাহলে মৃত্যুঝুঁকি কমে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুমের ঘাটতির কারণে উচ্চ রক্তচাপ, ডিমেনশিয়া, টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও হৃদরোগের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে।
দক্ষিণ কোরিয়ার প্রায় দুই হাজার ৮০০ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ওপর করা এক গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কম ঘুমানো মানুষের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি প্রায় ৭৩ শতাংশ বেশি। তবে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে প্রতি এক ঘণ্টার অতিরিক্ত ঘুম এই ঝুঁকি প্রায় ১৭ শতাংশ কমিয়ে দেয়।
সুইট স্পট হলো কোনো কিছুর সবচেয়ে কার্যকর বা আর্দশ অবস্থা। অর্থাৎ, যে অবস্থায় সবচেয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘুমের ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি ক্ষতিকর প্রভাবগুলো সর্বনিম্ন রাখতে ঠিক কতটা ঘুম জরুরি সেটাই হলো একজন মানুষের ঘুমের সুইট স্পট।
জার্মানির মিউনিখের ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সাইকোলজির ক্রোনোবায়োলজির অধ্যাপক টিল রেনোবার্গ বলেন, ‘প্রত্যেক মানুষকে অবশ্যই ঘুমের ঘাটতি পূরণ করতে হবে। কারণ, ঘুম আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলোর একটি।’
গবেষণাগুলোও ইঙ্গিত করে যে, বেশিরভাগ মানুষের জন্য প্রায় ‘এক থেকে দুই ঘণ্টা অতিরিক্ত ঘুম’ সুইট স্পট হতে পারে। যা শরীর ও মনে কার্যকর ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। তাই সপ্তাহ শেষে ছুটির দিনে একটু বেশি সময় ঘুমানো উপকারী হতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয়, দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকা যৌক্তিক।
বাংলাস্কুপ/ডেস্ক/এইচকে/এসকে
প্রিন্ট করুন
কমেন্ট বক্স